সুধন্যপুর মাদরাসা

দান করাকে ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল সাব্যস্ত করেছে। এর অনেক ফযীলতও বর্ণিত হয়েছে কুরআন-হাদীসে। তাই ইসলামের অপরাপর আমলের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ আমলটির জন্যও রয়েছে অনন্য সাধারণ কিছু নির্দেশনা ও নীতিমালা। যদি দানের ক্ষেত্রে সেগুলো রক্ষা করা হয় তাহলে এর যথাযথ প্রতিদান পাওয়া যাবে। আমাদের দান বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়ে পরকালে নিজের সামনে উপস্থিত হবে ইনশাআল্লাহ। কাজেই সে নির্দেশনাগুলো আমাদের জানা দরকার।

দান করার ফযীলত

নিয়ত সহীহ হওয়া

অল্প হোক আর বেশিদান করব আল্লাহর জন্য। নিয়ত শুদ্ধ করে সামান্য দানও যদি করতে পারিসেটি মৃত্যুর পরে কাজে আসবে এবং পরকালে আমার আমলনামায় পাওয়া যাবে। এমনকি যদি নিজের হালাল উপার্জন থেকে স্ত্রী ও পরিবারের জন্য খরচ করা হয় তাও বিফলে যাবে না। তার বিনিময়ে আল্লাহ দান করবেন সদকার সওয়াব। হাদীসে এসেছে – আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা-ই তুমি খরচ করবেতার প্রতিদান দেয়া হবেএমনকি স্ত্রীর মুখে তুমি যে খাবারের লোকমা তুলে দাও! -সহীহ মুসলিমহাদীস ১৬২৮সহীহ ইবনে হিব্বানহাদীস ৪২৪৯

হালাল অর্থ থেকে দান করা

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন – যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন থেকে একটি খেজুর পরিমাণ দান করে, –আর আল্লাহ হালাল’ ছাড়া গ্রহণ করেন না- আল্লাহ তা ডান হস্তে গ্রহণ করেন। অতঃপর তা লালন-পালন করে বড় করতে থাকেন। যেমন তোমরা ঘোড়ার বাচ্চা লালন-পালন কর। একপর্যায়ে এই সামান্য দান’ পাহাড়সম হয়ে যায়। -সহীহ বুখারীহাদীস ১৪১০সহীহ মুসলিমহাদীস ১০১৪

পছন্দের জিনিস থেকে দান করা

যা আমি দান করছি তা তো আসলে পরকালের জন্যই আল্লাহর হাতে রেখে দিচ্ছি। বীজের জন্য মানুষ ভালো ফসলটাই রেখে দেয়যাতে নতুন করে বীজ বোনা যায়। কাজেই মুমিনেরও উচিতহাতে থাকা সম্পদ থেকে উত্তমটাই আল্লাহর কাছে গচ্ছিত রাখা। নিজের পছন্দের জিনিসটি আল্লাহর পথে খরচ করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন – তোমরা কিছুতেই পুণ্যের নাগাল পাবে নাযতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু হতে (আল্লার জন্য) ব্যয় করবে। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ৯২

সাধ্য অনুযায়ী অল্প হলেও দান করা

কারো মনে এ ভুল ধারণা জন্মাতে পারেবা হতাশার উদ্রেক হতে পারে যেদান করার সাধ্য কি আমার আছেআমি স্বল্প আয়ের মানুষনুন আনতে পান্তা ফুরোয়আমি দান করব কীভাবে! নাহতাশার কোনো কারণ নেই! আল্লাহর রাস্তায় দান করার জন্য কাড়ি কাড়ি অর্থ লাগে না। ইসলামের শিক্ষা হলযার হাতে যতটুকু রয়েছেসাধ্যের ভিতর থেকে দান করবে। ইখলাসের সাথে হালাল রিযিক থেকে দান করলে সামান্য অর্থও আল্লাহ গ্রহণ করবেনএর বিনিময়ে দান করবেন পাহাড়সম নেকি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি। তাই তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য এক টুকরো খেজুর হলেও দান করতে বলেছেন।

দান করতে হয় কল্যাণ ও ন্যায়ের পথে

দান করতে হয় এমন খাতেযেখানে দান করলে অর্থটা কোনো ভালো কাজে খরচ হয়। যার মাধ্যমে দ্বীন-শরীয়তঈমান-আমল বা কোনো দ্বীনী বা মানবিক প্রয়োজন পূরণ হয়। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন – তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা কর। -সূরা মায়িদা (৫) : ২

দানের জন্য রয়েছে গরীব-দুঃখীবিধবা-অসহায়এতীম-মিসকীনমসজিদ-মাদরাসাওয়াজ-মাহফিল বা অন্য যে কোনো দ্বীনী প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দাওয়াতী কার্যক্রম।

ভারসাম্য রক্ষা করে দান করা

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পদ ব্যয় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে একজন মুমিন কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবেসেই নীতি সুস্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন। নবীজী বললেন – তুমি তোমার সন্তান-সন্ততিকে দরিদ্র অবস্থায় রেখে যাবে আর তারা মানুষের কাছে হাত পাতবেএরচে’ অনেক উত্তম হচ্ছে তাদেরকে সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়া। আর তুমি যে খরচই কর না কেনতা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে তবে আল্লাহ তোমাকে সওয়াব দান করবেন। এমনকি একটি লোকমাযা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও। (দ্র. সহীহ বুখারীহাদীস ৪৪০৯)

দান গোপনে করতে পারলেই বেশি ভালো

দান করব এমন চুপে চুপেযাতে কোনো ধরনের আত্মমুগ্ধতা বা আত্মপ্রচারের শিকার হতে না হয়। ডান হাত দান করবে তো বামহাতও যেন টের না পায়। হাদীসে এসেছেসাত ধরনের ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন। তার মধ্যে অন্যতম হল – যে এমনভাবে দান করে যেডানহাতে দান করলে বামহাতও টের পায় না। -সহীহ বুখারীহাদীস ১৪২৩

তবে হাঁকখনো গোপনে দান করার চেয়ে প্রকাশ্যে দানের মধ্যেও নিহিত থাকে অনেক কল্যাণ। যেমন দানের মাধ্যমে অন্যদের উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করা। এটাও যে দানের একটা গুরুত্বপূর্ণ খাতসেদিকে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা জরুরি।

প্রকৃত হকদারকে দান করা

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন – এক-দুই লোকমা খাবার বা এক-দুইটি খেজুরের জন্য যে মানুষের দ্বারে দ্বারে ধরনা দেয়- অভাবী তো সে নয়প্রকৃত অভাবী হলযার অভাব আছেকিন্তু তাকে দেখে তার অভাব আঁচ করা যায় নাযার ভিত্তিতে মানুষ তাকে দান করবে। আবার চক্ষুলজ্জায় সে মানুষের দুয়ারে হাতও পাততে পারে না। -সহীহ বুখারীহাদীস ১৪৭৯সহীহ মুসলিমহাদীস ১০৩৯

নিকটবর্তী লোকদের দান করা

দানের আরেকটি নিয়ম হল নিজের নিকটাত্মীয়দের আগে দান করা। এতে একদিকে যেমন সদাকার সওয়াব পাওয়া যায়একইসাথে আত্মীয়তার হকও আদায় হয়ে যায়। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি উৎসাহিত করেছেন এবং একে দ্বিগুণ সওয়াব লাভের মাধ্যম বলেছেন। তিনি বলেছেন – মিসকীনকে দান করলে কেবল দান করার সওয়াব লাভ হয়। আর আত্মীয়-স্বজনকে দান করলে দুটি সওয়াব- দান করার সওয়াব এবং আত্মীয়তার হক আদায় করার সওয়াব। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৬৫৮; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৬২৩৩

খোঁটা দিয়ে দান-অনুদান নষ্ট করে দিব না

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন – হে মুমিনগণ! খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের সদাকাকে সেই ব্যক্তির মত নষ্ট করো নাযে নিজের সম্পদ ব্যয় করে মানুষকে দেখানোর জন্য এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে না। সুতরাং তার দৃষ্টান্ত এরকম- যেমন এক মসৃণ পাথরের উপর মাটি জমে আছেঅতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ে এবং তা (সেই মাটিকে ধুয়ে নিয়ে যায় এবং) সেটিকে (পুনরায়) মসৃণ পাথর বানিয়ে দেয়। এরূপ লোক যা উপার্জন করেতার কিছুমাত্র তারা হস্তগত করতে পারে না।  -সূরা বাকারা (২) : ২৬৪

দান করব স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বপ্রণোদিত হয়ে

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিতএক লোক এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলকখন দান করা উত্তমতিনি ইরশাদ করলেন – যখন তুমি (অতি প্রয়োজন বা লোভের কারণে) মাত্রাতিরিক্ত মিতব্যয়ী বা হাড়কিপটে হও এবং সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশংকা করঅথবা যখন তুমি সুস্থাবস্থায় দীর্ঘায়ুর প্রত্যাশা কর তখন সদকা করা। এত দেরি করো না যেমৃত্যু এসে যায় আর তখন তুমি (ওসিয়ত করে) বলছ- আমার সম্পদগুলো অমুকের জন্যঅমুকের জন্য! অথচ (তুমি না বললেও) তা তাদের জন্য হয়েই আছে। -মুসনাদে আহমাদহাদীস ৯৭৬৮সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস ২৭০৬

দান করতে হয় নিজের প্রয়োজনে নিজ দায়িত্বে

وَ الَّذِیْنَ فِیْۤ اَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَّعْلُوْمٌ لِّلسَّآىِٕلِ وَ الْمَحْرُوْمِ.

আর যাদের সম্পদে নির্ধারিত হক’ (অধিকার) রয়েছে যাঞ্চাকারী ও বঞ্চিতদের। -সূরা মাআরিজ (৭০) : ২৪-২৫

অর্থাৎ কুরআনে কারীমে একে তাদের হক’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

সুতরাং দানকারীর মানসিকতা থাকবেদান করছি নিজের প্রয়োজনে। গ্রহীতা দানটা গ্রহণ করে কেমন যেন আমার প্রতিই এক ধরনের করুণা করল!

Scroll to Top